ভ্রমণ

চা-বাগানের সবুজ বুকে উমাবতী’র ঘাম!

মাথায় বুনো ঘাস-লতার বোঝা। ঘামে ভিজে সপসপে শরীর। পরনে হালকা ক্রিম রঙের পোশাক। যা দুই অংশে বিভক্ত; ঊর্ধাঙ্গে ছোলি, নিচের অংশে লুঙ্গির মতো কাপড় জড়ানো। ঘাসের ওপর শিশির বিন্দু যেমন আশ্রয় পায়, তার মুখেও তেমনিভাবে চক চক করছে ঘামের ফোঁটা। খানিক বিরতিতে টপটপ করে গাল-থুতনি বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা পড়ছে ঘাম। ঘাস-লতার ফাঁকে দিয়ে দৃষ্টি কাড়ে তার মায়াবী বিড়াল চোখের সরল চাহনী!

এমন কড়া রোদ, ভালো করে চোখ মেলে তাকানোর উপায় নেই। সূর্যের প্রখরতাকে হার মানিয়ে সবুজের বেষ্টনী কিছুটা হলেও চোখে প্রশান্তি আনে। টিলায় লজ্জাবতী গাছের বিছানা যেন; তাতে আলতো করে ছুঁয়ে দিলাম, আর সেই দৃশ্যটির ভিডিও ধারণ করছিলেন প্রকৃতির রূপে বিমুগ্ধ সহকর্মী শাওন। ওই সময়েই মুখভর্তি হাসি নিয়ে সামনে দাঁড়ালেন, ষাটোর্ধ্ব উমাবতী বাওলা। টিলার চা-বাগানে কলমের কাজ করছিলেন। আমাদের উদ্দেশ্য করে অস্পষ্টভাবে কিছু একটা বললেন, বুঝে নিয়ে উত্তর দিলাম ঢাকা থেকে এসেছি খালা। পাশে দাঁড়ানো সহকর্মী শাঁখা-পৈতা দেখে সংশোধন করে বললেন, ‘খালা না মাসি’! এরপর ক্ষণিকের আলাপচারিতা।

আলাপচারিতা শেষে অটোচালকের কাছ থেকে জানলাম এই শ্রমিকরা ‘দোশায়ালি’ ভাষায় কথা বলে থাকেন। চা বাগানগুলোতে কর্মরত চা শ্রমিকরা ১৫০ বছর পূর্বে ভারতের বিহার, মদ্যপ্রদেশ, উড়িষ্যা ও মাদ্রাজের (বর্তমান চেন্নাই) বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছে। পরবর্তীতে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে নিজেদের ভাষার সঙ্গে আঞ্চলিক বাংলার একটা মিশ্রণ ঘটিয়ে এই ভাষায় কথা বলেন।

মৌলভীবাজারের প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য কমলগঞ্জ উপজেলা। এই উপজেলার ন্যাশনাল টি বাগানের অংশে পদ্মছড়া লেক। মাধবপুর লেকে যাওয়ার পথে পড়ে পদ্মছড়া। মূল সড়ক থেকে আধা কিলো মতো ভাঙাচোড়া রাস্তা।

প্রায় চারঘণ্টা লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে হেঁটে বেশ পরিশ্রান্ত! উদ্দেশ্য ছিল মাধবপুর লেকে গিয়ে ভ্রমণযাত্রার ইতি টানা। অটোচালকের ‘অনুরোধের ঢেঁকি’ গেলা ছিল পদ্মছড়া লেক। পথের পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ল্যান্টানা, দাঁতরাঙাসহ নাম না জানা অসংখ্য বুনো ফুলের অভ্যর্থনায় একটু পরেই অনুধাবন করলাম ‘অনুরোধের ঢেঁকি’ গিলে ভুল করিনি। না হলে আফসোস করতে হত কবি গুরুর কবিতা আউরিয়ে ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে দুই পা ফেলিয়া…. ‘। যাই হোক পদ্মছড়ার রূপের বয়ান আরেকটি লেখায় দেব।

ফিরে আসি চা-শ্রমিক উমাবতীর কেচ্ছায়। তিনি কাজ করেন সরকারি চা-বাগান ন্যাশনাল টি বাগানে। তার সাতসকাল শুরু হয় চা-বাগানেই। রোদ-বৃষ্টিতে পুড়ে চা পাতা বা কুঁড়ি তোলা, কলম লাগানোর কাজ করেন। শ্রমের বিনিময়ে পাওয়া ১২০ টাকায় কায়ক্লেশে কাটে তার জীবন সংসার। পোষা গরুটার জন্য কাজ শেষে জঙ্গল পরিষ্কারের কাটা ঘাস নিয়ে ফেরেন বাড়ি। সংসারের জোয়াল টানতে গরুটাও যে তার আয়ের উৎস।

বুঝ হওয়া বয়সের পর থেকে প্রচণ্ড গরম, ঘেমে নেয়ে, চা বাগানের পোকামাকড় ও রক্তখোকা জোঁকের কামড় খেয়ে উমাবতীর গতর এখনও-শক্ত সমর্থ্য। ষাট পেরিয়েও কাজ করে যাচ্ছেন সমানে।

ন্যায্য মজুরি বঞ্চিত চা-শ্রমিকরা নিজেদের শ্রমের ঘামে চা বাগান টিকিয়ে রেখেছে। আর রক্ত চোষা জোঁক রূপী বাগান মালিকরা ফুলে ফেঁপে বিলাসিতায় গড়াগড়ি খাচ্ছেন।

উমাবতী প্রথমে ছবি তুলতে রাজি ছিলেন না। দাবি, চেহারা ভালো না, রোদে পুড়ে তামাটে গায়ের রঙ তার। যদিও চা বাগানের স্নিগ্ধ পরিবেশে কোমল হৃদয়ের উমাবতীদেরই মানায়। আমরা যারা চা-বাগানে ঘুরে হই-হুল্লোড় করে চাকচিক্য ছবি তুলি- তারা যেন উড়ে এসে জুড়ে বসার মতো!

একটু বোঝানোর পর ছবি তুলতে দিলেন এই চা শ্রমিক। উমাবতী বেশি কথা বলেননি। তবে তার মাথার বোঝা থেকে নূয়ে পড়া ঘাস-লতার ভেতর থেকে চেয়ে থাকা চাহনী বলে দেয় অব্যক্ত কথার ফুলঝুরি। জানান দেয়- চা-বাগানের সবুজ বুকে পাতার ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে থাকা তার বেদনাদায়ক গল্প।

সবুজের চাঁদোয়ায় ঘেরা টিলার উপরেই খাসিয়াদের কুটির। সেখানেই উমাবতীর ঘর। স্বামীসহ তার সংসারে তিন সন্তান। তার দুই মেয়েও তার মতো চা-বাগানের কুলি কামিন। শিক্ষা ও উন্নয়নের আলো তার পরবর্তী প্রজন্মেও পড়েনি।

সারা দেশে ১৬৭টি চা-বাগান আছে। বাগানগুলোতে প্রায় এক লাখ চা-শ্রমিক কাজ করছেন। তাদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি নারী শ্রমিক। এই শ্রমিকদের আছে আলাদা জীবনধারা, ভাষা-সংস্কৃতি। শ্রমিকরা নানাভাবে বঞ্চিত, দীর্ঘ সময় ভুগতে হয় পানির কষ্টে, না আছে টয়লেট, না একটু জিরানোর ব্যবস্থা। এর ফলে ভুগতে হয় জরায়ুর রোগসহ নানা রোগে।

উমাবতীর সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, পাশ থেকে আরেক চা-শ্রমিক বলে উঠলেন, ওর সাথে কি কথা বলবেন ও তো অবাঙালি। হ্যাঁ- উমাবতী অবাঙালি; ভারতের উরিষ্যা রাজ্য থেকে বৃটিশ পিরিয়ডে চা বাগানে আসে তার পরিবার। এরপর প্রজন্মের পর প্রজন্ম হাত ধরে কৈশোরেই তার চা-বাগানে কাজের অভিষেক। এরপর যৌবনও কেটেছে চা-বাগানে, এখন পড়ন্ত বয়সেও অভাবে ক্লিষ্ট সংসারের ভার টানছেন।

পানির কষ্টে হাঁসফাঁস অবস্থা হলেও উমাবতীর সঙ্গে কথা বাড়াতে চাইলাম। এমন সময় একজন পুরুষ শ্রমিক এসে জানালেন সাহেব (চা বাগানের ম্যানেজার) আসছেন। সবার মধ্যে একটু ব্যস্ততা যেন বেড়ে গেলো। কারণ বঞ্চিত হলেও চা বাগানের শ্রমিকদের কাছে এখনও সাহেব ও বড়বাবু (মালিক) মা-বাবা!

অগত্যা কথা শেষ করে আমরাও ফেরার উদ্যোগ নিলাম। পদ্মছড়া লেকের টিলা থেকে নামার আগে ছোট-খাট একটা বটগাছ দেখা গেল, গোড়ায় মোবাইল হাতে একটা কিশোরকেও বসে থাকতে দেখলাম, ফোরজি নেটওয়ার্কের বদৌলতে তার মোবাইলে ইউটিউবে হিন্দি গান বাঁজছে। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত শাওন ভাই একটু জিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিলেন, মন্দ হয় না ভেবে বটের গোড়ায় বসলাম! বটের তলায় ঝিরিঝিরি হাওয়া স্বস্তির পরশ বুলিয়ে দিলো……………

এমন আরও সংবাদ

Back to top button