নিত্য গোপাল তুতু।। শাপলা চত্বরের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সেনাপ্রধান অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল আজিজ আহমেদকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের ‘রেড নোটিস’ জারির উদ্যোগ নিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়।
এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোতে (এনসিবি) চিঠি দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম মঙ্গলবার সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন।
২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সহিংসতার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নিয়ে এই মামলা হয়েছে। ওই অভিযানের সময় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক ছিলেন আজিজ আহমেদ। পরে তিনি ২০১৮ সালের ২৫ জুন থেকে ২০২১ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর রেড নোটিসের উদ্যোগ
শাপলা চত্বরের ঘটনায় ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী। এরপর বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
তদন্তে ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে ঢাকা ও আশপাশের চার জেলায় অভিযানের সময় ৫৮টি হত্যার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে প্রসিকিউশন।
গত ২৭ জুলাই এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করে প্রসিকিউশন। অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতক ৩১ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। তাদের একজন সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ।
এবার সেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে তাকে খুঁজে বের করে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হচ্ছে।
ইন্টারপোলের ‘রেড নোটিস’ কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়। কোনো দেশের বিচারিক কর্তৃপক্ষের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা আদালতের আদেশের ভিত্তিতে পলাতক ব্যক্তিকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে সদস্য দেশগুলোর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সহযোগিতার অনুরোধ হিসেবে এটি জারি করা হয়। সংশ্লিষ্ট দেশে কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত ওই দেশের নিজস্ব আইনের ওপর নির্ভর করে।
দুর্নীতির অভিযোগেও তদন্ত
শাপলা চত্বরের মামলা ছাড়াও আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আজিজ আহমেদ এবং তার দুই ভাই হারিস আহমেদ ও তোফায়েল আহমেদ জোসেফের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার ও ক্রয়সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে সম্পদ অর্জন এবং মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে অর্থ ও সম্পদ রাখার অভিযোগের কথা উঠে আসে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আদালতে দেওয়া দুদকের এক আবেদনে তার বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থপাচার ও সম্পদ কেনার অভিযোগে তদন্ত চলার কথাও জানানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এর আগে ২০২৪ সালের ২০ মে দুর্নীতির অভিযোগে আজিজ আহমেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর তাকে ‘উল্লেখযোগ্য দুর্নীতিতে’ জড়িত থাকার অভিযোগে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ছিল, আজিজ আহমেদ সরকারি প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে তার এক ভাইকে অপরাধের দায় থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করেছেন। এ ছাড়া সামরিক ক্রয়চুক্তি ও সরকারি পদে নিয়োগে অনিয়ম এবং ঘুষের অভিযোগও আনা হয়।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আজিজ আহমেদ বলেছিলেন, তিনি কোনো রাজনীতি বা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন এবং কেন তাকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে তিনি বিস্মিত।
আলজাজিরার তথ্যচিত্রে আলোচনায় আসেন আজিজ ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আলজাজিরার অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ প্রকাশের পর আজিজ আহমেদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। তথ্যচিত্রে আজিজ আহমেদের ভাইদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলায় দণ্ডিত হওয়ার পর বিদেশে অবস্থান, তাদের সুরক্ষা দেওয়া, সামরিক ও সরকারি নিয়োগ এবং ক্রয়চুক্তিতে প্রভাব খাটানোর মতো বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হয়।
তবে তথ্যচিত্রে ওঠা অভিযোগকে তখন ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘অপপ্রচার’ আখ্যায়িত করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আজিজ আহমেদও অভিযোগগুলোকে ‘মিথ্যা, সাজানো এবং স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেছিলেন। এনআইডি নিয়েও তদন্ত আজিজ আহমেদের পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিয়েও একসময় তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
২০২৪ সালের জুনে তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল জানিয়েছিলেন, আজিজ আহমেদের দুই ভাই হারিস আহমেদ ও তোফায়েল আহমেদ জোসেফ ভিন্ন নামে বা ভুল তথ্য দিয়ে এনআইডি নিয়েছেন—এমন অভিযোগ তদন্তে কমিটি করা হয়েছে। তবে পরে ওই তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে আর কোনো তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
সব মিলিয়ে শাপলা চত্বরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর আজিজ আহমেদকে ধরতে ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়ার উদ্যোগ তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।



